ধর্মাশ্রিত রাজনীতির প্রকোপ এখন বিশ্বজুড়ে। বিগত শতাব্দীর ষাট-সত্তর দশকের প্রগতিশীল রাজনীতির অভিমুখ ছিল ধর্মকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিদেয় করতে না পারলেও সেটাকে ব্যক্তিপর্যায়ে সীমিত রেখে রাষ্ট্রাচার ও ব্যবস্থায় গৌণ করে ফেলে কল্যাণমুখী কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সেই সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিন, ক্যুবা, উত্তর কোরিয়া ও পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অভীষ্ট যেহতু ছিল পুঁজিবাদের বিকল্প সমাজ নির্মাণ তাই সেখানে ধর্মাচার মুখ্য ছিল না। ওই শিবিরের বাইরে তৎকালীন বিরাজমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাধীন সমাজগুলোতে চলমান আন্দোলনগুলোর মধ্যেও ধর্মাধিকারের প্রশ্নটি অন্যান্য অধিকার ও দাবি-দাওয়ার তুলনায় ছিল গৌণ। কারণ আন্দোলনকারী ও সমাজভাবুকদের চিন্তায় প্রাধান্য পেয়েছিল মানবেতিহাসের কলঙ্ক ধর্মাশ্রিত রাজনীতির বিভেদ ও রক্তপাত কাটিয়ে উঠে পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার জটিল বৈষম্যমূলক সম্পর্ক থেকে উত্তরণের বিষয়টি। এরকমই বৈশ্বিক এক বাতাবরণে দুই বাঙলাতেই ধর্মবিযুক্ত রাজনীতির একটা আলোড়ন এসেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাদের ইতঃপূর্বের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের মোহাবেশ থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক ভাষিক-সাংস্কৃতিক জাতিসত্তাকে আবিষ্কার করতে পেরেছিল যার পরিণতিতে হয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর এক বৃহৎ অংশ যাঁদের হৃদয়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ক্ষত তখনও দগদগে--তাঁরা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন পুঁজি ও শ্রমের বৈষম্যমূলক জটিল সমস্যা নিরসনে বিকল্প সমাজ গড়ার ভাবনায়। কিন্তু এ পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার না করার অঙ্গীকার নিয়ে যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় সেখানে দেখা গেল গোড়াতেই রাষ্ট্রাচার ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে ধর্মবিযুক্ততার বদলে চারটি ধর্মের (ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ) অনুসারীদের তুষ্ট করার আয়োজন। বাংলাদেশে অন্তত ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের চার মূলনীতির অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখের সঙ্গে সংগতি প্রদর্শনের অজুহাতে হলেও সংবিধানের সূচনায় ইহজাগতিক মানুষ ছাড়া কোনও অপার্থিব সত্তাকে কল্পনা করা হয়নি। কিন্তু ১৯৭৫-এর পরে সংবিধানের সূচনা করা হল ইসলাম ধর্মবিশ্বাসের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ দিয়ে যার মাধ্যমে অনঙ্গীভূত হয়ে গেল আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস বা অবিশ্বাস। এও সত্য ধর্মবিযুক্ততার চর্চা বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রাচারের কোথাও তেমন শেকড় গাড়তে পারেনি। তাই স্বাধীনতা আন্দোলনের কাণ্ডারি দল যাদের হাতেই দেখা দিয়েছিল সংবিধানে ধর্মবিযুক্ততার প্রাথমিক প্রয়াস তারাই গত দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন থেকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে ধর্মের ব্যবহারে অত্যুৎসাহী হয়ে পড়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বসতভিটা ও উপাসনালয়ের ওপর মুসলিম জনগোষ্ঠীর হামলা। একইভাবে সংখ্যানুপাতের বিপরীত চিত্রানুযায়ী বাম শাসনোত্তর পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু জনগোষ্ঠীর হাতে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে মুসলিম, দলিত ও অন্যান্যরা। সেখানকার রাজনীতিতে ধীরে ধীরে ঠাঁই করে নিচ্ছে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাজনৈতিক দল ও মত।
জর্নালের এ সংখ্যায় বাংলার ধর্মাশ্রিত রাজনীতির বিষয়টি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যাঁরা আলোচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সন্দীপন সেন, তুষার চক্রবর্তী, নন্দিনী ভট্টাচার্য, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ প্রামাণিক, পবিত্র সরকার এবং ঈপ্সিতা হালদার। ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করতে গেলে রাষ্ট্র যে ধরনের সঙ্কটে পড়ে তার কিছু উদাহরণও সারাহ্ সাহিদের আলোচনায় আমরা দেখতে পাই। সারাহ্র আলোচনা ঢাকার সর্বজনীয় (public) ভাস্কর্যে প্রতিফলিত ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশ্নসাপেক্ষ প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে। সারাহ্ দেখিয়েছেন ইসলামপন্থি সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে বাঙালি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিগুলোকে হিন্দুয়ানির তক্মা দিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারকে বাধ্য করছে সেগুলো পরিবর্তন করতে এবং ১৯৭১-এ মীমাংসিত হয়ে যাওয়া জাতিসত্তা সংক্রান্ত ‘বাঙালি না মুসলমান’ ভ্রান্তিটুকু পুনরায় সমাজজীবনে ফিরিয়ে আনতে।
ধর্মাশ্রিত রাজনীতির গণিতে একটি ভিন্নতর সমীকরণও সমাজতাত্ত্বিকদের মনোযোগের কারণ। অতীত ও সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা গেছে সামাজিক অন্যায়, অবিচার এবং বিরাজমান বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে জেগে ওঠা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণ আন্দোলনের সঙ্গে মাঝে মাঝে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পুরোহিত বা যাজক সম্প্রদায় এবং তার অনুসারীরাও যুক্ত হচ্ছেন। লাতিন আমেরিকার বামঘেঁষা আন্দোলনগুলির সঙ্গে ‘লিবারেশন থিওলজি’র সংহতি, রেজা শাহ পাহলভীর বিরুদ্ধে ইরানে সংঘটিত অভ্যুত্থানে আয়াতোল্লাদের ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। শুভ বসু তাঁর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ঔপনিবেশিককালে বাংলার নিম্নবর্গের মুক্তিকামী কৃষক সমাজের প্রতিভূ হিসেবে মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দীক্ষা ও গড়ে ওঠার পর্বটি আলোচনা করেছেন যা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ভাসানীর ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’র আপাত অসংগতি নিয়ে ওঠা অনেক প্রশ্নকে বুঝতে সাহায্য করবে।
এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দার্শনিক কার্ল মার্ক্স-এর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা, সভা-সেমিনার, এবং নানা ধরনের পাঠ-প্রকাশনা হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় এ সংখ্যায় আমরা পত্রস্থ করছি ফারুক চৌধুরীর ‘বাংলাদেশে মাক্র্স’ শীর্ষক দীর্ঘ আলোচনা। এ ছাড়াও বর্তমান সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা পরিস্থিতি নিয়ে শিশির ভট্টাচার্য্যের আলোচনা, কবি সুবোধ সরকারের প্রতিকবিতার অভিমুখ প্রসঙ্গে অর্ণব সাহা, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি নিয়ে সাদ কামালী এবং বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশের দৃশ্যকলাক্ষেত্রে প্রবণতা ও স্বতন্ত্র নন্দনভাবনার অনুপস্থিতি নিয়ে শিল্পসমালোচক আবুল মনসুরের পর্যবেক্ষণ। বরাবরের মতো জর্নালের এই সংখ্যায় থাকছে দুই বাংলার চারজন কবি ও চারজন গল্পকারের কবিতা ও গল্প এবং গল্পকার সুবিমল মিশ্র’র গল্পের ইংরেজি অনুবাদ