আমাদের বর্তমান সংখ্যার মূল আলোচ্য বিষয় বাংলায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার চড়াই-উতরাই যদিও ভৌগোলিক দিক থেকে একটি সীমিত ভূখণ্ডের ভাষাগোষ্ঠীর সমস্যাকে চিহ্নিত করে তবুও বলতে বাধা নেই যে বিশ্বরাজনীতির বর্তমান সংস্কৃতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব অন্য দেশ এবং ভাষাগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও কম প্রযোজ্য নয়। দেশে দেশে দক্ষিণপন্থী ধর্মাশ্রয়ী বর্ণবাদী প্রগতিবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষমতাগ্রহণ সমস্যাটির জটিলতা আরও ব্যাপক ও দুরূহ করে তুলেছে। প্রচলিত সামাজিক বিশ্বাস, ধর্ম ও সংস্কারের সমালোচনায় বিজ্ঞানমনস্ক, নিরীশ্বরবাদী-যুক্তিবাদী লেখকদের সরব হওয়ার আবহটি এখন প্রায় অনুপস্থিত। জনতোষণের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত মননের নিরাবেগ বিশ্লেষণ সমাদৃত হয় না। তারা একদিকে শিকার হন শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুরাঙানির অপরদিকে শাসকগোষ্ঠীর অনুগ্রহলাভকারী বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা হন অবহেলিত ও উপেক্ষিত। দ্বিতীয় ধরনের উপসর্গটিই উদ্বেগের বিষয়। বাংলাসহ সমগ্র উপমহাদেশে এ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন থেকে বিরাজমান। বাংলার নবজাগৃতির সময়কালেও যেমন আমরা দেখেছি যুক্তি ও নিরীশ্বরবাদী ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা (বিদ্যাসাগর) ও অক্ষয়কুমার দত্তকে আস্তিক ব্রাহ্ম ধর্মপ্রচারক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কতকগুলান নাস্তিক’ বলে অপবাদ দেওয়া তেমনি পরবর্তীকালে বিশ শতক ও একবিংশ শতক জুড়ে এই সমাজে দেখেছি অপছন্দ ও অসহিষ্ণুতার আরও জঘন্য বহিঃপ্রকাশ। বিশ-ত্রিশের দশকেই ঢাকায় শিখাগোষ্ঠীর অন্যতম কাজী আবদুল ওসুদ ও আবুল হুসেনকে ধর্মের যুক্তিবাদী সমালোচনা করায় নিগৃহীত হতে হয়েছে প্রভাবশালী জমিদার, বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের কাছে, স্বশিক্ষিত যুক্তিবাদী আরজ আলী মাতুম্বরকে শারীরিক নিগ্রহ থেকে আত্মরক্ষার জন্য চলাফেরা করতে হয়েছে সতর্কতার সঙ্গে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দেখেছি শাস্ত্রগ্রন্থের সমালোচনা করায় লেখক দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরিনকে দেশ থেকে নির্বাসিত হতে, রাজনৈতিক বা শাসকগোষ্ঠীর কৃপাপ্রার্থী না হওয়ায় যুক্তিবাদী নিরীশ্বরবাদী লেখক আহমদ শরীফ কিংবা হুমায়ুন আজাদকে গণমাধ্যম, বিদ্যায়তনিক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যথোপযুক্তভাবে মূল্যায়িত বা উদ্যাপিত না হতে। আমাদেরকে বরং প্রত্যক্ষ করতে হয় জনসমক্ষে প্রকাশ্যে চাপাতির ঘায়ে লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনসহ সমগোত্রীয় অন্যান্য লেখকদের প্রাণসংহারের ঘটনা। পাশের দেশগুলোতেও চিত্রটি ভয়াবহ রকমে অনুরূপ। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে তসলিমা নাসরিনকে বাস গোটাতে হয় পশ্চিমবঙ্গে; হিন্দু উগ্রবাদীদের হাতে খুন হন লেখক নরেন্দ্র দাভোলকর, এম. এম. কুলকার্নি, ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হন বিখ্যাত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন এবং পাকিস্তানে শরিয়া আইনের সমালোচনা করায় খুন হন পঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির।
উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিতকে মনে রেখেই এবারের মূল আলোচ্য বিষয়ে সন্নিবেশিত হয়েছে যতীন সরকার, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সেন, সুজয় ঘোষ, রণদীপম বসু এবং লাবণী জঙ্গীর আলোচনা। বিষয় সাযুজ্য তো বটেই বর্তমান সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকট জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিরাজমান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভিমুখটি কোন পথে হওয়া বাঞ্ছনীয় সে বিষয়ে জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন কাবেরী গায়েন তাঁর প্রবন্ধে। বিরঞ্জন রায় তাঁর নিবন্ধে আলোচনা করেছেন আধুনিক বিশ্ববীক্ষায় গ্রিক দার্শনিক এপিকুরসের প্রভাব নিয়ে।
বাংলাদেশের তরুণ সম্প্রদায় ক্রমবর্ধমান হারে ভাগ্যান্বেষণে বহির্মুখী বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ঠাই গড়ে নিতে তৎপর হয়েছে বিগত কয়েক দশক ধরে। তুলনামূলকভাবে অপেক্ষাকৃত কম অভীষ্ট লক্ষ্যস্থানগুলোও আজকাল বাদ যাচ্ছে না। পর্তুগালের রাজধানী লিসবোয়া শহরও তেমন একটি স্থান। এখানেও ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিজস্ব ঠাঁই। পর্তুগীজ নৃবিজ্ঞানী জোসে ম্যাপ্রিলের আলোচনা প্রবাসী এই বাংলাদেশী সম্প্রদায়কে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গেও দুটি আলোচনা থাকছে এবারের জর্নালে। ঋতুপর্ণা আলোচনা করেছেন রবীন্দ্র উপন্যাসের আলোকে নারীর স্বরূপ ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গ এবং অরুণাভের প্রবন্ধে উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিজ্ঞাপন জগতের অতীত ও বর্তমান তৎপরতার বিশ্লেষণ। আরও থাকছে সম্প্রতি পরলোকগত বিশিষ্ট লেখিকা মহাশ্বেতাকে নিয়ে বাংলা দলিত সাহিত্যের পুরোধা মনোরঞ্জন ব্যাপারীর রচনা এবং কবি মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় রহস্যমুক্তকরণের শৈলী নিয়ে চিরন্তন সরকারের আলোচনা।
উল্লিখিত আলোচনা ও প্রবন্ধগুলির পাশাপাশি বর্তমান সংখ্যায় থাকছে রুবাইয়াৎ আহমেদের প্রণয়োপাখ্যান এবং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের তিন জন গল্পকারের গল্প, চার জন কবির কবিতা এবং জনম মুখার্জির দুটি ইংরেজি কবিতা।