আমাদের বর্তমান সংখ্যাটির ছাপাখানায় যাওয়ার প্রস্তুতি যখন চলছিল সেই অক্টোবর মাসেই দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক নিপীড়িত নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মারণযজ্ঞ নতুন উৎকট বীভৎসতায় ফেটে পড়ল। এমন মারণযজ্ঞের ঘটমান বিবরণ তৎক্ষণাৎ মুঠোফোন এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে বাহিত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের আনাচে কানাচে নানা সমাজে, গোষ্ঠীতে। তা সত্ত্বেও সকলেই যেন একে অপরের কাছ থেকে বিযুক্ত ও বিচ্ছিন্ন এবং হয়ে পড়ছে সংবেদহীন। প্রায় অবরুদ্ধ ‘গাজা’ নামক এক চিলতে ভূখণ্ডে গাদাগাদি করে থাকা সেই জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হলে ত্রিশ দিনে তিন হাজারেরও বেশি শিশু! মিনিটে ২৫টি করে শিশু নিধনের এই বর্বরতাতেও সবাই যেন ভ্রূক্ষেপহীন, নির্বিকার! কিন্তু কবির প্রতিবাদের কলম তো থেমে থাকে না। ওই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও অবরুদ্ধ গাজার মানচিত্র ফেটে ফিলিস্তিনী কবিদের কবিতা ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাই নিয়ম ভেঙে এবার আমরাও বাংলা জর্নাল-এর রচনাক্রম শুরু করছি সময়ের ডাকে সাড়া দেওয়া শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি কবিতা দিয়ে।
বর্তমান সংখ্যার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ‘মুঠোফোন বা চলভাষে মনোজগৎ এবং বাঙালির উপনিবেশায়িত মন।’ এই বিষয় বেছে নেওয়ার পেছনে যে ভাবনাটি কাজ করেছে তা হচ্ছে, অবাধ এই তথ্যপ্রবাহ, সামাজিক যোগাযোগ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যুগেও ব্যক্তিমানুষের সত্তা কি স্বাধীন হতে পারছে, না কি তার মনোজগৎ নতুনভাবে উপনিবেশায়িত হচ্ছে তারই অজ্ঞাতে আরেক ধরনের অতি পরাক্রমশালী অদৃশ্য শক্তির দ্বারা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদ থেকে।
ঔপনিবেশিকতার, বিশেষ করে, ইঙ্গ-সাম্রাজ্য দ্বারা শাসিত হওয়ার এবং তৎসূত্রে লব্ধ জ্ঞান ও বিশ্ববীক্ষার যে পরিসীমা বাঙালির মানসে ঠাঁই পেয়েছে তা থেকে বেরোনোর বা তাকে অতিক্রম করে কোনো স্বকীয় চিন্তা-ভাবনার পরিসর যেন সে করতে পারছে না। এর নিদর্শন আমরা দেখতে পাই উপমহাদেশের, বিশেষ করে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোর আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে। আন্তর্জালের সুবাদে ইংরেজিতে অনিয়োরোপীয় অনিঙ্গ বিশ্বের সংবাদমাধ্যম সুলভ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সংবাদকর্মীদের উপনিবেশায়িত মন সেগুলোকে আস্থায় নিতে পারছেন না। এখনও তাঁদের মন কেবল ইঙ্গবলয়ের সংবাদসূত্রকে বস্তুনিষ্ঠ মনে করে। যদিও দুই দশক আগে ইরাকে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র মজুত রয়েছে বলে ইঙ্গবলয়ের দেওয়া খবরটি যে সম্পূর্ণ বানোয়াট ছিল সেটার প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন।
ঔপনিবেশিকতার জের ও নয়া ঔপনিবেশিকতার মিশেলেই সম্ভূত আমাদের নিত্য-নব সাম্প্রতিক। আর এই নিত্য-নব সাম্প্রতিকতার অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে মুঠোফোন বা চলভাষ। যোগাযোগ মাধ্যমের এই নতুন উপায় মানুষের ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার বেগ অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সত্য, কিন্তু সেই সঙ্গে তৈরি করছে নতুন ধরনের অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা। ব্যক্তি ও সমাজের মানস গড়নে এসব প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাবের নানা দিক নিয়ে তিনটি আলোচনা আমার পত্রস্থ করছি।
মুঠোফোনের ব্যবহার এবং মনোজগতে এর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় নিরন্তর ঘটে যাওয়া সামাজিক দৃশ্যপটের আলোকে মিথ্যা-সত্যের চিরচেনা ছকের পাল্টে যাওয়া নিয়ে এক জিজ্ঞাসুর দৃষ্টিতে মামুন হুসাইন আমাদের মুখ্য আলোচনার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন। ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অমিতা চ্যাটার্জির গবেষণা-নিবন্ধে উঠে এসেছে ভুয়ো খবর এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের মধ্যেকার তফাৎ নির্ণয়ের জটিলতা ও সমস্যা। আমিনা খাতুন তাঁর আলোচনায় বোকাবাক্স তথা টেলিভিশন, মুঠোফোন ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সখ্যতার বদলে বিচ্ছিন্নতার অদৃশ্য দেওয়াল গড়ে ওঠা এবং একাকিত্ব ও বিষণ্ণতার মতো অবক্ষয়ী প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনেছেন।
মূল আলোচ্য বিষয়ের বাইরে এবারের সংখ্যায় আলেকজান্দ্রা কোলোনতাই নিয়ে হিমানী বন্দ্যোপাধ্যায়, সোভিয়েত সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে নন্দিনী ভট্টাচার্য, মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে ফারুক চৌধুরী, সাধু-চলতি ভাষার তর্ক নিয়ে আত্মজিৎ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ও শেকস্্পিয়রের কন্যা প্রসঙ্গে মোহীত উল আলম, মার্কসের পুঁজি গ্রন্থ নিয়ে প্রশান্ত ধর, কবি মধুসূদন প্রসঙ্গে সন্দীপন সেনের প্রবন্ধসহ আরও কিছু বিষয়ে অন্যান্য রচনার পাশাপাশি রয়েছে একাধিক কবিতা ও গল্প।