প্রথমেই একটা কথা বলা দরকার। এই প্রবন্ধটির মূল বিষয় হলো, উত্তরভারতীয় উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে সাম্প্রদায়িকতার স্থান। মধ্যযুগে মুসলিমদের আগমনের পর হিন্দু ও মুসলিম সঙ্গীতের মিশ্রণের ফলে যে নতুন এক সঙ্গীত-ধারার সূচনা হয়, সেখানে সাম্প্রদায়িকতা কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছিল মূলত সেটাই এখানে বলার বিষয়। কিন্তু সে আলোচনায় যাওয়ার আগে সঙ্গীতের উৎপত্তি ও তার ক্রমবিকাশ নিয়ে কিছুটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে নিতে চাই। সঙ্গীতের ব্যাপ্তি বিশাল সমুদ্রের মতো। এত তার বৈচিত্র্য, এত তার রূপ যে, অতি বড়ো পণ্ডিতের পক্ষেও সঙ্গীতের সমস্ত দিক সম্পূর্ণভাবে অধিগত করা প্রায় অসম্ভব। তাই তার মধ্যে একটা সরু পথ কেটে নিয়ে তার মধ্যেই আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করব।
মানুষের মধ্যে কীভাবে সঙ্গীতের সৃষ্টি হলো তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতির মধ্যে নানান কাল্পনিক গল্প-কাহিনি আছে; তার মধ্যে থেকে কয়েকটি বলা যাক। প্রায় সমস্ত জাতির প্রাচীন নানা কিংবদন্তি বা মিথ্ বলে যে, সঙ্গীত দেবতা বা দেবতাদের সৃষ্টি যা তাঁরা মানবজাতিকে প্রদান করেন। যেমন, ধরা যাক, পাশ্চাত্য সঙ্গীত। সঙ্গীতের আধুনিক ইংরেজি ‘Music’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Muse’ থেকে। সরাসরি নয়, লাতিন, ফরাসি ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার মধ্য দিয়ে। প্রাচীন গ্রিক ধর্ম, পুরাণ ও কিংবদন্তি অনুযায়ী দেবরাজ জিউস এবং স্মৃতির দেবী নেমোসিনির নয় কন্যাকে একত্রে বলা হয় ‘মিউজ’, যদিও এঁদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা নামও আছে। এঁরাই হলেন সঙ্গীত, নৃত্য ও শিল্পের দেবী। মানুষের সঙ্গীতের পেছনে এঁরাই আছেন। এঁরা আবার মানুষের দুঃখ বেদনার কষ্টও ভুলিয়ে দেন। ভেবে দেখুন, প্রকৃত সঙ্গীত কিন্তু আমাদের দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দিতে অনেকটাই সাহায্য করে।
আরবীয়দের মধ্যে একটা প্রবাদ আছে, হজরত মুসা পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণকালে দৈববাণী শুনতে পান, “হে মুসা, তোমার অসা (এক প্রকার লাঠি বা দণ্ড) নিয়ে সামনের পাথরে আঘাত কর।” সেই নির্দেশানুসারে তিনি সামনের পাথরে আঘাত করতেই সেটি সাতটি টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে এবং সেগুলি থেকে সাতটি জলধারা বেরিয়ে আসে। সেই সাতটি জলধারা থেকেই নাকি সঙ্গীতের সাতটি স্বরের উৎপত্তি। তাদের আর একটা প্রবাদে সাতটি ছিদ্রযুক্ত একটা পাখির কথা বলা হয় যার সাত রকম স্বর থেকেই সাত স্বরের উৎপত্তি।
জাপানের প্রবাদ অনুযায়ী সূর্য পত্নী আমাতেরাসু দেবতাদের কাছে অপমানিতা হয়ে পর্বতের এক গুহায় আত্মগোপন করেন। অনুতপ্ত দেবতারা অনেক অনুনয় বিনয়ের পরও যখন তাঁকে সেখান থেকে বের করে আনতে পারলেন না, তখন তাঁর রাগ ভাঙাবার জন্য তাঁরা সঙ্গীত সৃষ্টি করলেন।
হাওয়াই দ্বীপে সঙ্গীতের প্রচলন নিয়ে একাধিক প্রবাদ আছে। তার একটি হলো, দেবী লাকা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলিতে পরিভ্রমণকালে সেখানে পবিত্র লামা কাঠ মাটিতে প্রোথিত করে সেখানকার মানুষদের প্রার্থনা সঙ্গীত ও হুলা নাচ শেখান যার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে মিলতে পারবে।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক হলো, চৈনিক কিংবদন্তি। সেখানে বলা হচ্ছে, প্রাচীন এক সম্রাট হুয়াংদি’র অনুরোধে দক্ষ কারিগর ও সঙ্গীতজ্ঞানী লিং লুন পশ্চিমের কুনলুন পর্বতে গিয়ে বাঁশ কেটে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের বারোটি বাঁশের নল তৈরি করে বিভিন্ন পাখির ডাক শুনে সেগুলিতে বারোটি স্বর স্থাপন করেন এবং এভাবেই পৃথিবীতে সঙ্গীত ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাদটা এখানেই শেষ নয়। এই বারোটি স্বর নিছক সঙ্গীত ধ্বনিই নয়, এদের সঙ্গে প্রকৃতি ও মহাজাগতিক সম্পর্ক–কার্ল সেগানের ভাষা ধার করে বলা চলে, “কসমিক কানেকশন” বর্তমান। বারোটি মাস এবং মহাকাশের বারোটি রাশির সঙ্গে এদের যোগসূত্র আছে।
আমাদের দেশে প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী সঙ্গীত দেবতার সৃষ্টি। বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে সবরকম গানই বিষ্ণুর অংশ। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে, চতুর্বেদের স্রষ্টা স্বয়ং ব্রহ্মা সঙ্গীতবিদ্যা সৃষ্টি করে সেই বিদ্যা শিবকে প্রদান করেন। আবার শিব সেই বিদ্যা সরস্বতীকে শেখান। তাই সরস্বতীকে সঙ্গীতের দেবী বলে আরাধনা করা হয়। ভারতীয় দর্শনে শব্দ বা ‘নাদ’কে জগতের আত্মা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সমগ্র জগৎই সঙ্গীতময়। পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যেই সঙ্গীত অনাদিকাল থেকে ঝঙ্কৃত হয়ে আসছে। নৃত্য সম্পর্কে বলা হয়েছে– নৃত্য দুরকমের। মেয়েদের নৃত্য হলো লাস্য যা দেবী পার্বতীর সৃষ্টি এবং ছেলেদের নৃত্য তাণ্ডব মহাদেব সৃষ্টি করেন এবং পরে তিনি তাঁর অনুচর তণ্ডুকে এই নৃত্য শেখান যাঁর নামে এই নৃত্যের নামকরণ।
এবার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে সঙ্গীতকে দেখা যাক। প্রথমে আলোচনা করব সঙ্গীত বলতে আমরা কী বুঝি তাই নিয়ে। আমরা জানি, কথা বলা বা কোনো কিছুর আঘাতে বায়ুতে ঢেউয়ের মতো যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তা আমাদের কানে শব্দ বা ধ্বনি হিসেবে ধরা পড়ে। এই সব শব্দের মধ্যে সঙ্গীত হলো এমন কিছু sound বা ধ্বনির সমষ্টি যা পরস্পরের সঙ্গে সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে একটি ধ্বনিপ্রবাহ সৃষ্টি হয় যা আমাদের কর্ণেন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এক তৃপ্তিদায়ক মধুর অনুভূতির সৃষ্টি করে। এ জন্য প্রয়োজন হয় সাতটি প্রধান ধ্বনির, যাকে আমরা বলি সাতটি স্বর। এই সাতটি স্বর হল সরগমপধন। এই সাতটি স্বরের মধ্যে রগমধন—এই পাঁচটি স্বরের আবার আর একটি করে রূপ আছে, যাকে আমরা বলি বিকৃত রূপ। অতএব, মূল সাতটি এবং বিকৃত পাঁচটি নিয়ে মোট বারোটি স্বর দিয়েই সঙ্গীত গড়ে উঠেছে। এই বারোটি স্বর আসলে হলো কতকগুলি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের শব্দতরঙ্গ। সমস্ত দৈর্ঘ্যের শব্দতরঙ্গ আমাদের মস্তিষ্ক ধরতে পারে না। ২০ থেকে ২০,০০০ কুড়ি হাজার হার্জ পর্যন্ত শব্দতরঙ্গ আমাদের কান বুঝতে পারে। তার মধ্যে এই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বারোটি স্বর—যা আসলে বারো ধরনের শব্দতরঙ্গ তাই-ই হলো সঙ্গীতের স্রষ্টা। স্বরগুলির এই পারস্পরিক সম্পর্ক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরা যাক, সা-এর শব্দ তরঙ্গের দৈর্ঘ্য যদি ২৪০ হয়, তাহলে তার ওপরের বা চড়ার সা-এর শব্দতরঙ্গের দৈর্ঘ্য হবে তার ঠিক দ্বিগুণ অর্থাৎ ৪৮০। অর্থাৎ দুটি শব্দই আমাদের কানে একইরকম শোনাবে, শুধু দ্বিতীয়টি প্রথমটির তুলনায় হবে তীক্ষ্ণ। যে-কোনো স্কেল থেকেই সা ধরুন না কেন, এ দুটির ratio বা আনুপাতিক মান একই থাকবে। সা-এর পরিপ্রেক্ষিতে বাকি স্বরগুলির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এক এক রকম হবে। যেমন, সা-এর চতুর্থ স্বর মা হবে সা-এর শব্দতরঙ্গের চারের তিন অর্থাৎ তার শব্দতরঙ্গের দৈর্ঘ্য হবে ৩২০, পঞ্চম স্বর পা হবে সা-এর তিনের দুই অর্থাৎ ৩৬০। অন্যান্য স্বরগুলিও এইভাবেই সা-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হবে। তা না হলে সে শব্দতরঙ্গ হবে সঙ্গীতের অনুপযুক্ত, বেসুরো বা কর্কশ যাকে ক্যাকোফনি বলা হয়। বিজ্ঞান গবেষণাগারে এই সমস্ত শব্দতরঙ্গেরই ছবি তোলা যায়। তাতে দেখা যায়, কর্কশ বা গোলমালজনিত শব্দের ঢেঊয়ের চেহারা এলোমেলো, বিশৃঙ্খল, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন যা কানের পর্দাকে আঘাত করে কর্ণপীড়ার সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, সাঙ্গীতিক ধ্বনির যে ঢেউ, তা নিয়মিত, সুশৃঙ্খল ও সুসংলগ্ন যা কানের পর্দায় এসে সুখকর অনুভূতি প্রদান করে।
বর্ণমালা যেমন সাহিত্য নয়, বর্ণ বা অক্ষরের নানা অর্থবহ মিশ্রণের দ্বারা শব্দ ও একাধিক শব্দের দ্বারা বাক্য ও একাধিক বাক্যের মধ্য দিয়ে যেমন গল্প, কবিতা, উপন্যাসের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনিভাবেই এই বারোটি স্বরের সঠিক মিশ্রণ বা পারমিউটেশন ও ক্যম্বিনেশনের মধ্য দিয়ে সঙ্গীত সৃষ্টি হয়, তাই এই বারোটি স্বরকে সঙ্গীতের বর্ণমালা বলা যেতে পারে। সাহিত্যের মান যেমন সাহিত্যিকের প্রতিভার ওপর নির্ভর করে, তেমনই সঙ্গীতের মান সঙ্গীতজ্ঞের ক্ষমতা ও প্রতিভার ওপর নির্ভর করে।
কীভাবে ও কখন সঙ্গীতের উৎপত্তি হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের কিংবদন্তিগুলো চিত্তাকর্ষক বা ইন্টারেস্টিং হলেও এ সবই আমাদের ধর্মীয় কল্পনা। দেবতাও আমাদের কল্পনার ফসল। এক্ষেত্রে দার্শনিক বা বিজ্ঞানীরা কী বলেন? সঙ্গীত কেন ও কীভাবে সৃষ্টি হলো? তাঁরা বলেন, ভাষা ও সঙ্গীত মানুষেরই সৃষ্টি—দেবতার নয়। গান না ভাষা কোনটি আগে সৃষ্টি তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সারের (১৮২০-১৯০৩) মতে ভাষা ও সঙ্গীত হাত ধরাধরি করে এক সঙ্গে এগিয়েছিল।
আমরা জানি, যখন কথা উঁচু নিচু প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন সুরে উচ্চারিত হয় তখন তার থেকেই হয় গানের সৃষ্টি। আর তার সূচনা হয়েছিল আদিম মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে যখন ভাষা সেভাবে দানা বাঁধেনি। তখন তাদের ভাষায় শব্দ সংখ্যা ছিল সীমিত যা দিয়ে সমস্ত প্রয়োজন বোঝানো যেত না। একই শব্দ উঁচু বা নিচু স্বরে উচ্চারণ করে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বোঝানো হতো। চীনা ভাষায়ও কিন্তু তেমনটাই দেখা যায়। সেখানে অনেক শব্দ আছে যা ভিন্ন ভিন্ন স্বরে উচ্চারণ করলে তার অর্থ বদলে যায়। চীনা ভাষার মতো না হলেও সম্ভবত সব ভাষাতেই কম বেশি এমন উদাহরণ আছে। বাংলা ভাষাতেও আছে। আমরা যখন আবেগতাড়িত হয়ে কথা বলি তখন তার স্বর বদলে যায় বা চড়ে যায় এবং মানেও বদলে যায়। তাছাড়া, সঙ্গীত সৃষ্টির পেছনে প্রকৃতির অবদানও ছিল অসীম। বিভিন্ন সুর উচ্চারণ করতে হলে সেগুলো আগে শোনার প্রয়োজন হয়। পশুপাখির ডাক, মেঘের আওয়াজ, ঝর্নার বা নদীর বয়ে যাওয়া জলের কলধ্বনি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের শব্দ মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল সেগুলিকে নকল করতে। যেমন কিছু কিছু পাখি অন্য শব্দ নকল করতে পারে। সঙ্গীতের সৃষ্টি সম্পর্কে অনেক পণ্ডিতই অনেক কথা বলেছেন। যেমন ডারউইন বলেছেন, সঙ্গীত হলো মানুষের বিবর্তনের উপজাত বা by product, সঙ্গীতের উৎপত্তি যৌন নির্বাচন থেকে। অর্থাৎ গান স্ত্রী-পুরুষকে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ করে, যেমন পুরুষ পাখি মিলিত হওয়ার জন্য স্ত্রী পাখিকে নানান সুরে ডাকে। এটা মানবজাতটাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে জরুরি।
এরপর মানবজাতি যতই সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে লাগল, ততই সঙ্গীত মানব জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়তে শুরু করল। বিভিন্ন জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যের ফলে যেসব নিদর্শন মিলেছে তার মধ্যে জীবজন্তুর হাড় দিয়ে আদিম মানুষের তৈরি বাঁশির নিদর্শন পাওয়া গেছে, পরে কাঠ ও বাঁশের ব্যবহারও শুরু হয়। তাছাড়া, পশুর চামড়া দিয়ে নানা রকম তালবাদ্যের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। আসলে একেবারে আদিম যুগে মানুষের কাছে হাড় বা পশুর চামড়ার বেশি কিছু উপকরণ ছিল না। ধাতব তার তখনও আবিষ্কার হয়নি, কাজেই প্রথম যুগের তারযন্ত্রে তারের বদলে ছিল চর্মতন্তু যা জীবজন্তুর নাড়িভুড়ি দিয়ে তৈরি। গান আর বাজনার সঙ্গে একইভাবে নৃত্যও যুক্ত হয়েছিল। আনন্দ প্রকাশের একটা বড়ো মাধ্যম হলো নৃত্য। অতিমাত্রায় আনন্দিত হলে মানুষ তার সমগ্র দেহের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার সেই আনন্দ প্রকাশ করতে চায়। আবার যুদ্ধের উন্মাদনা ও উত্তেজনাও নাচের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা যায়। তারপর যখন মানুষের কল্পনায় দেবতার সৃষ্টি হল, তাদেরকে সন্তুষ্ট করার এবং নিজের ভক্তিকে প্রকাশ করার মাধ্যমও হয়ে উঠল সঙ্গীত—অর্থাৎ, গীত, বাদ্য ও নৃত্য। পরে সামাজিক অনুষ্ঠানের সঙ্গেও সঙ্গীত এক অনিবার্য অঙ্গ হিসেবে জড়িয়ে গেল। বহু আদিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেই নাচ, গান ও বাদ্য পরস্পরের সঙ্গে একেবারে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গান বাদ দিয়ে নাচ হয় না। আবার নাচ ও গানের ছন্দ ও তাল রাখার জন্য তালবাদ্যও ব্যবহার করা হয়। বাজনার তালে তালে পদবিক্ষেপ করে সমস্ত দেহকে আন্দোলিত করে মনের ভাবকে প্রকাশ করা হয়। শুধু আনন্দই নয়, মানুষের আনন্দ, দুঃখ, শোক, ভক্তি, ক্রোধ, কাম–সমস্তই এই সঙ্গীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
আর একটা কথা বলা দরকার। আমাদের গান-বাজনায় শুদ্ধ ও বিকৃত মিলিয়ে বারোটি স্বরের ব্যবহার থাকলেও আদিম মানুষ কিন্তু অতগুলো স্বরের ব্যবহার জানত না। এক বা দুই কিংবা তিন স্বরের মধ্যেই তাদের সঙ্গীত সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর যাযাবর মানুষ যখন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন সভ্যতা সৃষ্টি করল তখন ক্রমশ তাদের সঙ্গীতও উন্নত হতে শুরু করল এবং তারও অনেক পরে মানুষ সাতসুরের ব্যবহার শিখল। প্রাচীন সমস্ত সভ্যতায়ই সঙ্গীতের নিদর্শন মেলে। সে প্রাচীন মিশর হোক, ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয়ই হোক আর চীন সভ্যতাই হোক। ভারতবর্ষে তো বটেই। যদিও সেই সুদূর প্রাচীনকালে তার প্রকৃতি ঠিক কী রকম ছিল, সেটা আমরা জানি না।
এবার ভারতের কথায় আসা যাক। প্রথমে বলব সিন্ধু সভ্যতার কথা যার সূচনা হয় আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, যে সভ্যতার কথা ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে জানা যায়নি। আর সেখানে খননকার্য শুরু হয় বিংশ শতকের প্রথম দিকে ১৯১৯ নাগাদ, জন মার্শালের নেতৃত্বে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দয়ারাম সাহানী প্রমুখ ব্যক্তির দ্বারা। পরে আবার ১৯৪৬ সালে মর্টিমার হুইলার সেখানে আরও বেশি খনন কার্য চালিয়ে আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করেন। এই সভ্যতা ছিল ব্রোঞ্জ যুগের। এখানে যে সব সীল পাওয়া যায় তার মধ্যে কয়েকটি পোড়া মাটির সীলে নৃত্যরত মূর্তি, বাঁশি, ঢোল, খঞ্জনি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের ছবি খোদিত আছে। তাছাড়া, ব্রোঞ্জের একটি নৃত্যরতা নারীমূর্তিও পাওয়া গেছে। এগুলি দেখলে বোঝা যায় এই সভ্যতাতেও বেশ ভালোরকমই সঙ্গীতের প্রচলন ছিল, যদিও সে সঙ্গীত ঠিক কীরকম ছিল তার স্বরূপ জানা সম্ভব হয়নি। যেমন জানা যায়নি তাদের ধর্ম ঠিক কেমন ছিল, যদিও তা নিয়ে নানারকম মত ও বিতর্ক আছে। হতে পারে তারা প্রাকৃতিক শক্তিকে অর্চনা করত, হতে পারে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অঙ্গ ছিল সঙ্গীত। সীলের গায়ে যে সব অক্ষর খোদিত রয়েছে তার পাঠোদ্ধার এখনও পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। ফলে নিশ্চিতভাবে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো ধারণা করা সম্ভব নয়।
আর্যরা আনুমানিক দু হাজার খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে মধ্য এশিয়ার স্তেপ উপত্যকা অঞ্চল থেকে (যা বর্তমান রাশিয়া, কাজাকস্তান, উজবেকিস্তান অঞ্চল।) ভারতে আসে। তারা নদীসমৃদ্ধ সুজলা সুফলা ভারতে থিতু হয়ে বসতে বেশ কিছুটা সময় নেয়। চাষবাস, পশুপালন শুরু হয়। খাদ্য সংগ্রহের কঠিন কাজ সহজ হয়ে পড়ায় তারা ক্রমশ নানা দার্শনিক চিন্তায় মন দিলে সঙ্গীত, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্ন বিদ্যাচর্চার সূত্রপাত হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তার আগে আর্যদের মধ্যে সঙ্গীত ছিল না। যে কোনো আদিম মানুষের মধ্যেই অঙ্কুরাকারে সঙ্গীত ছিলই। যতই তারা সভ্য হতে থাকে ততই তাদের সঙ্গীত ক্রমোন্নতির পথে অগ্রসর হয়। সেই সময়ে হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার মানুষ এবং আর্যরা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন অংশে বাস করত বিভিন্ন অনার্য জনগোষ্ঠীর মানুষ। তারাও বিভিন্ন সময়ে আর্যদের আগে ভারতে এসেছিল। তারা কৃষিকাজ জানত যদিও হরপ্পার মতো কোনো সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি। পরবর্তীকালে আর্য ও অনার্যদের সংস্কৃতি ও রীতিনীতি পরস্পরের ওপর প্রভাব ফেলে। সঙ্গীতও তার থেকে বাদ পড়েনি।
যাই হোক, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দেড় হাজার বছর নাগাদ বেদ লেখা শুরু হলো। বেদ সংখ্যায় চারটি–ঋক্, যজু, সাম ও অথর্ব। বৈদিক সাহিত্য ভারতের তো বটেই, পৃথিবীরও প্রাচীনতম সাহিত্য। আবার এই চারটি বেদের মধ্যে ঋক্ সবচেয়ে প্রাচীন। বেদগুলিকে চারটি শাখায় ভাগ করা হয়, যথা—সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও ঊপনিষদ্। চারটি বেদকে একত্রে সংহিতা বলা হয়, আবার প্রতিটি বেদে বৈদিক মন্ত্রাদির ব্যাখ্যা দেওয়া আছে, যা থেকে গৃহীর পূজা, যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠানবিধি তৈরি হয়েছে। এই অংশটিকে ব্রাহ্মণ বলা হয়। ব্রাহ্মণের পরিশিষ্ট ভাগ হলো আরণ্যক যেখানে বার্ধক্যে সন্ন্যাসধর্ম নিয়ে যারা অরণ্যে বাস করতে চায় তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ যাগযজ্ঞের নিয়মাবলি দেওয়া আছে। এখানে অনুষ্ঠানের বদলে দার্শনিক চিন্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই গভীর দার্শনিক চিন্তার যে ফসল তাই হলো উপনিষদ। বেদের শেষ বলে একে বেদান্তও বলা হয়। সেই সময় যেহেতু লিখিত পদ্ধতির সৃষ্টি হয়নি, সেজন্য বেদের সূক্তগুলি মুখে মুখে বলা হতো এবং মনে রাখার চেষ্টা করা হতো, যার জন্য বেদের আর এক নাম শ্রুতি। সহজে মনে রাখার জন্য বেদপাঠ সুর করেই করা হতো। বেদের–বিশেষ করে সামবেদের স্তোত্র বা মন্ত্র পাঠও সুর সহযোগেই করা হতো। এইভাবেই গড়ে উঠেছিল বৈদিক গান। আর, তখন থেকেই বেদগান বাদ্য ও নৃত্য সহযোগেই হতো যদিও সেই বাদ্য ও নৃত্য হয়তো আদিম পর্যায়েই ছিল। তাছাড়া, যেহেতু তখনও সঙ্গীতের আদিম অবস্থা সে জন্য খুব সম্ভবত সেই সামবেদের যুগে সাত স্বরের মধ্যে এক থেকে তিনটি স্বর ব্যবহার করা হতো। এক স্বরের গানকে বলা হয় আর্চিক। সামবেদের স্তোত্রগুলি মোটামুটি দু’ ভাগে বিভক্ত। তার প্রথমভাগকে বলা হয় আর্চিক। হয়তো সে অংশটি এক সুরেই গাওয়া হত। সামবেদের গান বা গাথা অংশে হয়তো দুই স্বরের ব্যবহার ছিল যার জন্য দুই স্বরের গানকে বলা হয় গাথিক। বৈদিক সামগান কালক্রমে তিনস্বরে উন্নীত হয়েছিল, যার জন্য তিন স্বরের গানকে বলা হয় সামিক। চার স্বরের গান স্বরান্তর, আর যাঁরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছেন তাঁরা বাকিগুলো জানেন। পাঁচস্বর বিশিষ্ট রাগকে ঔড়ব, ছয়স্বর বিশিষ্ট রাগকে ষাড়ব ও সাতস্বর বিশিষ্ট রাগকে সম্পূর্ণ বলা হয়। বৈদিক সামগান তিন স্বরেই গাওয়া হতো, যদিও স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের মতো সঙ্গীতবেত্তাদের মতে সেই সময়ে চার বা পাঁচ স্বরেরও ব্যবহার ছিল যদিও এই মতের পেছনে তেমন কোনো জোরালো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। কিন্তু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে সঙ্গীত ক্রমশ তিন স্বর থেকে সাত স্বরে উন্নীত হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে এক, দুই, তিন বা চার স্বরের গানের প্রচলন নেই। সামবেদের গাথা অংশ দু ভাগে বিভক্ত ছিল। গ্রামগেয় এবং অরণ্যগেয়। সাধারণ সমাজের জন্য গ্রামগেয় এবং অরণ্যচারী সন্ন্যাসীদের জন্য অরণ্যগেয়। বৈদিকোত্তর যুগে অর্থাৎ ছশো খ্রিষ্টাব্দ থেকে মার্গ সঙ্গীত বা যাকে গান্ধর্ব সঙ্গীতও বলা হতো, আরও উন্নতি লাভ করে। এ ছাড়া, খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে প্রবন্ধ সঙ্গীতের কথা জানা যায় যা কারুর কারুর মতে বর্তমান ধ্রুপদের পূর্বপুরুষ।
আমি বার বার সঙ্গীত শব্দটা ব্যবহার করছি। আমরা সঙ্কীর্ণ অর্থে সঙ্গীত বলতে সাধারণত গানকেই বুঝি—যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীত—অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের গান, ধর্মীয় সঙ্গীত—অর্থাৎ ধর্মপ্রধান গান, কণ্ঠ সঙ্গীত—অর্থাৎ খালি গলায় গাওয়া গান, যদিও তাতে যন্ত্রের অনুষঙ্গ থাকতে পারে। বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে যে সুর সৃষ্টি হয় তাকে যন্ত্রসঙ্গীত বলে থাকি। এতে ভুল নেই। কিন্তু প্রাচীনকালে সঙ্গীত বলতে বোঝাত, গীত, বাদ্য ও নৃত্য অর্থাৎ গান, বাজনা ও নাচের সম্মিলিত রূপকে, শুধুমাত্র গান নয়। প্রাচীন সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থগুলিতে সেভাবেই বলা আছে। কিন্তু সবকিছুর যেমন বিবর্তন হয়, তেমনি ভাষার বিবর্তনে সঙ্গীতের অর্থ এখন এমনই দাঁড়িয়েছে। সঙ্গীতের আর একটি সংস্কৃত প্রতিশব্দ হল তৌর্যত্রিক। শাস্ত্রগ্রন্থগুলিতে এই শব্দটাও ব্যবহার করা হয়েছে। আমি অবশ্য এখানে প্রধানত কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীতকেই আলোচ্য বিষয় হিসেবে রেখেছি। আমার আলোচনায় নৃত্যের কথা তেমনভাবে আসবে না।
ভারতীয় সঙ্গীত সপ্তস্বরে পরিণত হওয়ার পর ক্রমশই তা দুটি স্পষ্টভাগে বিভক্ত হয়ে যায়—মার্গ সঙ্গীত ও দেশি সঙ্গীত। দেশি সঙ্গীত হল আঞ্চলিক বা লৌকিক সঙ্গীত যাকে আজ আমরা লোকসঙ্গীত বলে থাকি। দেশি সঙ্গীত কোনো নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ ছিল না। অঞ্চলভেদে বিভিন্ন সুরে লোকে মনের আনন্দে নিজের মতো করে যে গান গাইত তাই হল দেশি বা লৌকিক সঙ্গীত। এই লৌকিক সঙ্গীতেরই নানা সুরকে ঘষেমেজে, নানা দিক থেকে নিয়মের কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে সৃষ্টি হয়েছিল অভিজাত দেশি সঙ্গীত বা মার্গ সঙ্গীত যার মূল উপকরণ ছিল রাগ। সঙ্গীতই হল ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হবার পথ বা মার্গ, তাই মার্গসঙ্গীত। বলা হয়, বর্তমানকালের যে রাগ সঙ্গীত তা মার্গ সঙ্গীতের বিবর্তনের ধারায় নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে। অবশ্য একদল পণ্ডিতের মতে প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে যে গান্ধর্ব গীতির উল্লেখ আছে যা নাকি গন্ধর্ব জাতির লোকেরাই গাইত তা এবং মার্গ সঙ্গীত নাকি আসলে এক এবং তা মর্ত্য থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানকালের যে উচ্চাঙ্গ বা রাগ সঙ্গীত তার জন্ম দেশি সঙ্গীত থেকেই, যাকে বলা হতো অভিজাত দেশি। আর অপর ধারাটি ছিল লৌকিক সঙ্গীত যা সাধারণ মানুষ গাইত। সে যাই হোক, মার্গ বলি বা অভিজাত দেশি সঙ্গীতই বলি সেটি এবং দেশি বা লৌকিক সঙ্গীত–এই দুই ধারাই কিন্তু একে অন্যের কাছ থেকে উপকরণ আহরণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। মার্গ বা অভিজাত দেশি সঙ্গীতই বেশি ঋণী। মনে রাখতে হবে, সেই প্রাচীন যুগেও কিন্তু ভারতীয় সঙ্গীত শুধুমাত্র আর্যদেরই একার অবদান ছিল না। বিভিন্ন অনার্য জাতির নিজস্ব সুর মার্গ সঙ্গীতে এসে মিশেছিল। লোকসঙ্গীতও বিভিন্ন অঞ্চলে তার নানা রূপ নিয়ে বিকশিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
মার্গ বা রাগ সঙ্গীতের অন্তর্গত বিভিন্ন রাগের নামে বোঝা যায় সেগুলির মূল ছিল স্থানীয় লৌকিক সুর, যেমন, রাগ কর্ণাট, গুর্জরী, মুলতানী, বৃন্দাবনী সারং, মারোয়া, মাণ্ড, বঙ্গালী, পাহাড়ি ইত্যাদি। আবার লোকসঙ্গীতের বহু গানেই খাম্বাজ, ঝিঁঝিট বা ঝিঞ্ঝোটি, কাফি, পিলু, ভৈরবীর সুরের আভাস লক্ষ করা যায়। এখানে রাগ বলতে কী বোঝায় তা একটু ছোটো করে বলে নেওয়া ভালো। সঙ্গীতরত্নাকরে বলা আছে, স্বর ও বর্ণবিশিষ্ট যে ধ্বনিবিশেষ লোকের চিত্তকে অনুরক্ত করে তাই-ই রাগ। স্থূলভাবে বলতে গেলে রাগ হচ্ছে কতকগুলি নিয়মের ওপর ভিত্তি করে বারোটি স্বর থেকে কিছু স্বর বেছে নিয়ে তাদের পারম্পর্যযুক্ত শ্রুতিমধুর পারমিউটেশন ক্যম্বিনেশন। মোট সাতটি শুদ্ধ স্বর আছে—যথাক্রমে সা রে গা মা পা ধা নি। এই স্বরগুলিকে আমরা আরোহণক্রমে বলতে পারি সারেগামাপাধানি, আবার অবরোহণ ক্রমে নিধাপামাগারেসা। আবার এদের মধ্যে রে গা মা ধা নি–এই পাঁচটি স্বরের বিকৃত রূপ আছে।এই পাঁচটি বিকৃত স্বরের মধ্যে রে গা ধা নি হলো কোমল স্বর যেগুলি শুদ্ধ স্বরের চাইতে আধ স্বর নীচে; আর মা হলো তীব্র বা কড়ি স্বর যা শুদ্ধ মা-এর চাইতে আধ স্বর উঁচুতে। এক একটা রাগে এক এক ধরনের স্বর ব্যবহার করা হয়। কোনোটায় হয়তো সব কটা স্বরই শুদ্ধ—যেমন, বিলাবল; কোনোটাতে হয়তো সব কটা কোমল স্বরই ব্যবহার করা হয়–যেমন, ভৈরবী; আবার কোনোটাতে হয়তো সবগুলোই শুদ্ধ স্বর, শুধু কড়ি বা তীব্র মা ব্যবহার করা হয়—যেমন, ইমন। তাছাড়া কোনো রাগে পাঁচ স্বর ব্যবহার করা হয়—যেমন, ভূপালি। এতে সারেগাপাধা এই পাঁচটা স্বর ব্যবহার হয়, মানি বর্জিত। আবার কোনো রাগে ছয় আবার কোনো রাগে সাতটি স্বরই ব্যবহার করা হয়। কোন রাগ কখন গাওয়া হবে তার সময় নির্দিষ্ট করা আছে, যেমন ভৈরব সকালে গেয়, পূরবী সন্ধ্যায়, মালকোষ মধ্যরাতে। আবার কিছু রাগ ঋতুকালীন, যেমন মল্লার জাতীয় রাগ বর্ষাকালে; সারং জাতীয় রাগ গ্রীষ্মকালে; বসন্ত, বাহার ইত্যাদি রাগ বসন্তকালে গাওয়া হয়। কোনো রাগ যদি ধ্রুপদের স্টাইলে গাওয়া হয়, তাহলে তাকে সেই রাগের ধ্রুপদ বলা হবে, যেমন, মালকোষ রাগের ধ্রুপদ। আবার যদি কোনো রাগ খেয়ালের স্টাইলে গাওয়া হয়, তাহলে তাকে সেই রাগের খেয়াল বলা হবে, যেমন বেহাগ রাগের খেয়াল ইত্যাদি। অর্থাৎ রাগকে ভিত্তি করেই ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি ও টপ্পা গাওয়া হয়। রাগের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলি বাহুল্য ভয়ে ও অপ্রয়োজনীয় বোধে লিখছি না।
এবার আলোচনার মূল বিষয় অর্থাৎ মধ্যযুগ বা মুসলিম যুগে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বিকাশ নিয়ে আলোচনায় আসা যাক। অবশ্য ‘ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত’ বললেও সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ছড়িয়ে আছে আমার আলোচনাটা সীমাবদ্ধ থাকবে তার মধ্যেই। বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে দক্ষিণ ভারত জুড়ে যে উ