এই প্রথমবারের মতো বাংলা জর্নালে কোনও একটি বিষয়ে আলোকপাতের জন্য অতিথি সম্পাদক হওয়ার জন্য বাংলাভাষীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল 'নতুন প্রজন্মের বাঙালির চিন্তা-ভাবনা' যেহেতু এই সংখ্যার মুখ্য আলোচনার বিষয় সেক্ষেত্রে ওই প্রজন্মের মধ্য থেকেই না হয় কেউ না কেউ এগিয়ে আসুক অতিথি হিসেবে সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে। আশা করেছিলাম অধিকাংশ বাংলাভাষী অধ্যুষিত বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ছাড়িয়েও প্রবাসের নানা জায়গায় গড়ে ওঠা বাংলাভাষী লেখকদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ হয়তো এগিয়ে আসবেন। কার্যত দেখা গেল একমাত্র বাংলাদেশ থেকে সহুল আহমদ এবং সারোয়ার তুষার এগিয়ে এলেন। জর্নাল তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁদের সম্পাদিত অংশ থেকে অন্তত নতুন প্রজন্মের বাঙালির চিন্তা-ভাবনার একটা আংশিক পরিচয় আমরা পাচ্ছি এবং তা প্রধানত বাংলাদেশ এবং মধ্যবিত্তের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবনাকেন্দ্রিক। কিন্তু অতিথি সম্পাদকদ্বয় যেমন, তেমনি আমরাও জর্নালের পক্ষ থেকে স্বীকার করছি যে এই পরিবেশনাতেও একটা লৈঙ্গিক (কোনও নারীর প্রতিনিধিত্ব নেই) ভারসাম্যহীনতা রয়ে গেছে। সহুল এবং সারোয়ারের ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও এই ফাঁকটা পূরণ করা গেল না।
অতিথি সম্পাদকদ্বয়ের সম্পাদিত অংশের বাইরে জর্নালের নিয়মিত পরিবেশনার মধ্যে রয়েছে ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক ভিন্নতা নির্বিশেষে নবীন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকর্ষণ নিয়ে সন্দীপন সেনের আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অন্যান্য প্রযুক্তির একটি পার্শ্বসুফল হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর পুনরুজ্জীবন বা সচলায়তন। কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে এরকম ঘটছে। অনুরূপ উদাহরণ বাংলাভাষীদের সন্নিহিত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর বেলায়ও দেখা যাচ্ছে। ভাস্বতী রায় তাঁর নিবন্ধে এই নতুন প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে কীভাবে রাজবংশী কামতাপুরী ভাষা আন্দোলন দানা সংহত হচ্ছে তা আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে আবার এই নতুন প্রযুক্তিগত মাধ্যম কীভাবে নারীকে তার নিজস্ব স্বর ও সত্তার আপন পরিসর খুঁজে নিতে সাহায্য করছে সেই দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন সম্প্রীতি মুখার্জি তাঁর আলোচনায়। অর্ণব সাহা ১৯ শতকের ঔপনিবেশিক বাংলায় জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে দাম্পত্য সম্পর্ক, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে প্রথাগত মূল্যবোধের সঙ্গে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের টানাপোড়েন নিয়ে অনুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন। তন্ময় মালাকার তাঁর অনুসন্ধানে দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিককালে ভারতে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী কী করে ভারতীয়দের ওপর চালানো শারীরিক অত্যাচারকে পুলিশি নির্যাতনের অঙ্গীভূত করে আইন বৈধতা দিয়েছিল। আমাদের বৌদ্ধিক চর্চায় মধ্য এশিয়ার সমাজ সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত যদিও ওই অঞ্চলের সঙ্গে ঐতিহাসিক দিক থেকে পাক-ভারত-বাংলার যোগসূত্রটা বেশ পুরোনো। নন্দিনী ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন থেকে ওই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করে আসছেন। তিনি তাঁর নিবন্ধে উত্তর-সোভিয়েত সময়ে তাজিক কবিরা জাতীয় সত্তার নবনির্মাণে কী ভূমিকা পালন করছেন সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এই সঙ্গে পত্রস্থ করছি কাজাখস্থানে আয়োজিত এশীয় সাহিত্যিকদের সম্মেলনে প্রদত্ত লেখক অমর মিত্রের ভাষণ। তা ছাড়াও রয়েছে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত আবুল হাসনাত সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে আমিনা খাতুনের পর্যালোচনা, নীরব ক-এর কবিতা এবং সৃষ্টিশীলতার চূড়ান্ত পর্বে অকাল প্রয়াত বাংলাদেশের প্রখ্যাত গল্পলেখক ও ঔপন্যাসিক শহীদুল জহিরের গল্প কাঠুরে ও দাঁড়কাক-এর অনুবাদ।
জর্নালের নিয়মিত পরিবেশনায় চেষ্টা থাকে বাংলা ও বাঙালি সম্পর্কে অবাঙালি বা অ-বাংলাভাষীর লেখা প্রকাশের। কোনও অবাঙালির হাতে বাংলাভাষায় রচিত কোনও লেখা জর্নাল কখনও পরিবেশন করতে পারেনি। সম্ভবত সমকালীন অধিকাংশ বাঙালি পাঠক পরিচিত কেবল কবি-প্রাবন্ধিক উইলিয়াম রাদিচের বাংলা লেখার সঙ্গে। বিদ্যায়তনিক গবেষণাচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা হয়তো আরও কিছু অবাঙালি (যেমন রুশ, চৈনিক) গবেষক-অধ্যাপকের বাংলা রচনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে থাকতে পারেন যা সাধারণ পাঠকের জানার কথা নয়। এবারে জর্নাল সেই সুযোগটা পাঠকদের দিচ্ছে তরুণ পোলিশ লেখক কামিল শেদচিন্স্কি-র সরস বাংলা রচনা পরিবেশন করে।