আমাদের বর্তমান সংখ্যার মূল আলোচ্য বিষয় বিশ্বমারি করোনার অভিঘাত। আমাদের প্রশ্ন ছিল করোনার অভিঘাতে আমরা কি নিজের ও স্বজনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকার পাশাপাশি আমাদের চারপাশের যেসব মানুষ জীবিকার জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তাকেও আশ্রয় করার অবকাশ পাননি তাঁদের কষ্টলাঘবের কথা আদৌ ভাবতে পারছি নাকি প্রকট বৈষম্য ও শ্রেণিস্বার্থের নগ্ন চেহারাকেই স্বাভাবিক নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছি?
বিশ্ব এখন তার স্বাভাবিকতায় ফেরার পথে এবং ইতোমধ্যেই ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা আগে ঘটে যাওয়া মারি ও মড়কের অভিজ্ঞতায় বর্তমান করোনার অভিঘাত নিয়ে হয়তো নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মগ্ন। তবে আমরা চেয়েছি আমাদের চারপাশের সমাজে গেল দু বছর যাবৎ মানুষ যেসব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে তার কিছু খণ্ডচিত্রকে তুলে আনতে। তাছাড়া এই বিশ্বমারি নিয়ে মানুষের মনে প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধি, মুনাফামুখী চিকিৎসা-বিজ্ঞান ও গবেষণা, সর্বোপরি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে যেসব মত ও সন্দেহ রয়েছে সেসবেরও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে নিম্নবিত্ত, সহায়হীন মানুষেরা কীভাবে এই সংকটের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেছে তার হদিশ নিতে বিভিন্ন সূত্রে জানার জন্য চেষ্টা করেও কোনও লেখা আমরা জোগাড় করতে পারিনি। এই ঘাটতির জন্য করোনার অভিঘাত সংক্রান্ত পরিবেশনায় আমাদের প্রত্যাশা অপূরণীয় থেকে গেল।
করোনার মোকাবিলায় রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত “লকডাউন” নিম্নবিত্ত ও সহায়হীনদের চিরচেনা ক্ষুধা ও জীবিকার সংগ্রামকে কী পরিমাণ নির্মম এবং মৃত্যুকে কতটা বীভৎস ও সংবেদহীন করে তোলে সেসব টুকরো অভিজ্ঞতার গাথা জনম মুখার্জির আলোচনা। সহায়হীন নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা, বাড়ির বুয়ার কাজ করার কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লেখিকারূপে স্বীকৃত বেবী হালদার তাঁর লেখায় লকডাউনে কাদের লাভ কাদের ক্ষতি সে নিয়ে আলোকপাত করেছেন। শক্তিনাথ চক্রবর্তীর আলোচনায় বিশ্বমারি নিয়ে যেসব সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জমি তৈরি হয়েছে জনমানসে সেসবের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আর স্থবির দাশগুপ্ত করোনা নিয়ে তাঁর সুদীর্ঘ আলোচনায় লোকস্বাস্থ্য এবং আর্থ-সামাজিক সংকটের সঙ্গে কৃষ্টির বা দৃষ্টিভঙ্গির সংকটের ফলে যে অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মূল আলোচ্য বিষয়ে উল্লিখিত চারটি রচনার পাশাপাশি রয়েছে করোনাকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আমিনা খাতুনের পর্যালোচনা।
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধটি ঔপনিবেশিকতামোচনের কালে যে ন্যায্য সাম্যবাদী ইহলোক নির্মাণের কল্পস্বর্গীয় আকাঙ্ক্ষা তথা ইউটোপিয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল তা উত্তর-ঔপনিবেশিককালে কেন দৃশ্যমান হয়নি সেই প্রসঙ্গে। দেবজ্যোতি মণ্ডল কবিতার ভাবনা ও তার স্বরূপ জীবনানন্দ দাশের কাব্যবোধ ও চর্চায় কীভাবে ধরা দিয়েছে তা গভীর অভিনিবেশসহকারে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর রচনায়। অনুরূপভাবে হাসনারা খাতুনের রচনায় উঠে এসেছে সাহিত্যিক আফসার আমেদ কীভাবে গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত মৌখিক সাহিত্যরীতি কিস্সাকে তাঁর রচনায় লেখ্যরূপ দিয়েছেন এবং মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে নারীর অধস্তন অবস্থার চিত্র এঁকেছেন সেই প্রসঙ্গ। এবারের সংখ্যায় আমরা ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং চলচ্চিত্রকর মৃণাল সেনের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দুটি রচনা পরিবেশন করছি। হাসান আল জায়েদ তাঁর রচনায় পূর্ববৎ সমালোচকদের দৃষ্টিতে ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস চাঁদের অমাবস্যা-র প্রধান চরিত্র আরেফের মূল্যায়নে একধরনের ঊনতার উল্লেখ করে নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে তার বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। বিধান রিবেরুর আলোচনা মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রকর্মের সার্বিক বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা নিয়ে।
বর্তমান সংখ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে আলোচনা রয়েছে। যে বিয়োগান্তক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তাকে শেক্সপিয়রীয় রচনার আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন মোহীত উল আলম তাঁর আলোচনায়। অপর রচনায় শাহাদাত এইচ খান দেখিয়েছেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে নিক্সন ও কিসিঞ্জারের সাম্রাজ্যবাদী মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্ধারিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যর্থতা ডেকে আনে এবং অগণিত বেসামরিক নিরস্ত্র বাঙালির হত্যাকাণ্ডকে সম্ভব করে তোলে। এছাড়া এ সংখ্যায় রয়েছে অষ্টাদশ শতকের বাংলায় চার দলিত নারীর ভূমিকা নিয়ে মনোহর মৌলি বিশ্বাসের নাতিদীর্ঘ আলোচনা, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাকিস্তান সফরের দিনলিপি, কবিতা ও অনূদিত কবিতা এবং গল্প।