চলমান বিশ্বমারি* কোভিড-১৯ এর কারণে আমরা গত বছর বাংলা জর্নালের প্রকাশনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। এ বছর জর্নাল যথারীতি স্বাভাবিক প্রকাশনায় ফিরছে। তবে স্বাভাবিকতায় ফেরার প্রত্যয় নিয়েও আমরা হৃদয়ের সন্তাপ প্রকাশ না করে পারছি না মারির নির্দয় ছোবলে অগণিত মানুষের মৃত্যুর কারণে। বাংলা জর্নাল হারিয়েছে সম্পাদনা পর্ষদের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর মৃত্যু আমাদের পত্রিকার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ইত্যবসরে জর্নাল যাতে আরও বেশি পাঠকের কাছে সহজলভ্য এবং পাঠপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাঠক ও লেখকের মধ্যে যোগাযোগের পথ সহজ হয় সে লক্ষ্যে আমরা কাগজে ছাপা সংস্করণের পাশাপাশি পত্রিকাটির বৈদ্যুতিন সংস্করণও আন্তর্জালে www. banglajournal.org সংযোগনীড়ের (website) মাধ্যমে অতি স্বল্পমূল্যে সুলভ করেছি।
যেহেতু পৃথিবীর মানুষ এখন চলমান মারির ব্যাপকতা ও তার অভিঘাতের পরিণাম সম্পর্কে একরকম অন্ধকারে তাই এ নিয়ে অভিজ্ঞতার বয়ান বা কোনও রকমের উপসিদ্ধান্ত টানার সময় এখনও আসেনি। সংগত কারণেই এই সংখ্যায় বিশ্বমারিকে বিষয় হিসেবে না নিয়ে আমরা পূর্বনির্ধারিত মূল প্রসঙ্গ তথা বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজভাবনা বিষয়ে আলোকপাতের চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে পরিবেশিত তিনটি রচনার মধ্যে সহুল আহমদ তাঁর আলোচনায় গণহত্যার স্মৃতি ও রাজনীতি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। আমিনুর রহিম আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাপ্নিক ও রূপকার শেখ মুজিবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিবর্তনের সূত্র ধরে তাঁর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার কার্যকারণ আর আফসান চৌধুরী তাঁর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস চর্চার অংশ হিসেবে আলোকপাত করেছেন সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ও তার চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য নিয়ে। নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের ধারায় বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় যে নির্দয় শোষণমূলক ব্যবস্থার শিকার নগরের গরিব জনগোষ্ঠী সে নিয়ে তথ্য-উপাত্তের নিরিখে আলোচনা করেছেন। ফারুক চৌধুরী।
২০২০ সাল ছিল প্রবাসে ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার শততম বার্ষিকী। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই পুরোধা বাঙালি মানবেন্দ্রনাথ রায় ও মুজফ্ফর আহমদকে নিয়ে এবারের সংখ্যায় রয়েছে একাধিক রচনা। সুচেতনা চট্টোপাধ্যায় তাঁর আলোচনায় দেখিয়েছেন পূর্ববাংলার অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ জনপদ সন্দ্বীপ থেকে ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আগত মুজফ্ফর পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা ও খেটেখাওয়া মানুষদের জীবন-সংগ্রাম থেকে কী করে ধীরে ধীরে নিজেকে কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত করলেন। মুজফ্ফরকে নিয়ে করা অভিসন্দর্ভের ভিত্তিতে ইংরেজিতে রচিত সুচেতনার বই An Early Communist Muzaffar Ahmad in Calcutta 1913 1929-এর পর্যালোচনা করেছেন আনু মুহাম্মদ। এ ছাড়াও রয়েছে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মার্কসীয় চিন্তা-ভাবনা নিয়ে টাইসন রিয়েল স্ট্র্যান্ডলুন্ডের আলোচনা।
এ সংখ্যায় প্রকাশিত তিনটি অনুবাদের মধ্যে রয়েছে আফ্রো-ক্যুবান কবি জর্জিনা হেরেরার একগুচ্ছ কবিতা। মূল স্পানঞল থেকে ইংরেজিতে এগুলো অনুবাদ করেছেন কৌশল্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। গভীর দুঃখের বিষয় হচ্ছে জর্জিনা সানন্দে কৌশল্যাকে তাঁর কবিতা অনুবাদ করার অনুমতি দিয়েছিলেন কিন্তু নিজে দেখে যেতে পারলেন না কারণ কোভিড হানা দিয়ে তাঁকে নিয়ে গেল গত ১৩ই ডিসেম্বর। অন্য দুটি অনুবাদের একটি ক্যামেরুনের দার্শনিক বুদ্ধিজীবী আশিল ম্বেম্বে এবং অপরটি নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদের সাক্ষাৎকার। ম্বেম্বের সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন সারোয়ার তুষার এবং আসাদেরটি শিশির ভট্টাচার্য্য। দুই বাংলাতেই অনুবাদক হিসেবে জর্নালের সম্পাদনা পর্যদের প্রয়াত বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুখ্যাতি এতই ব্যাপ্ত যে তাঁর কবিসত্তাটি অনেকাংশে তাতে ঢাকা পড়ে গেছে। হামীম কামরুলের আলোচনাটি কবি মানবেন্দ্রকে পাঠকের সামনে নতুন আলোকে উপস্থিত করতে সাহায্য করবে।
জর্নালের নিয়মিত পরিবেশনায় চেষ্টা থাকে বাংলা ও বাঙালি সম্পর্কে অবাঙালি বা অ-বাংলাভাষীর লেখা প্রকাশের। গতবার আমরা প্রকাশ করেছিলাম তরুণ পোলিশ লেখক কামিল শেদচিন্স্কি-র সরস বাংলা রচনা। এবার থাকছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চৈনিক লেখক পাই খাই ইউয়ানের নাতিদীর্ঘ একটি লেখা। সর্বজনীয় (public) বুদ্ধিজীবী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন মিহির ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে একটি বিশ্লেষণী রচনা রয়েছে অর্ণব সাহার। ঔপন্যাসিক বঙ্কিমকে নিয়ে বাঙালির দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে সন্দীপন সেনের আলোচনাটি নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাবে বলে বিশ্বাস। এছাড়া রয়েছে তিনটি গল্প এবং বেশ কিছু কবিতা ।
pandemic এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে দুই বাংলাতে অতিমারি শব্দটি কেন যে ব্যবহৃত হচ্ছে তা আমার বোধগম্য নয়। অতি উপসর্গটি pan-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। pan-এর মানে এখানে বিশ্বজুড়ে এই মারির সংক্রমণকেই বোঝানো হয়েছে তাই বিশ্বমারি শব্দটি ব্যবহার করেছি