রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা জর্নালের বর্তমান সংখ্যার পরিকল্পনাটি বিগত দুই বছর ধরে মাথায় ঘুরছিল। এ উপলক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় নানা ধরনের আলোচনা, পর্যালোচনা ও প্রকাশনার সম্ভাবনা আঁচ করেই আমাদের মনোযোগ বাংলায় ওই বিপ্লবের প্রভাব নিয়েই সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিই। বিষয়টি ঘিরে জর্নালের লেখা আহ্বান সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিটি চূড়ান্ত করার মুহূর্তে ঘটে ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনাবসান। ফলে বিরাজমান বিশ্ববাস্তবতায় তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ভূমিকা নির্ণয়ে রুশ বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা আমাদের কাছে আরও বড়ো হয়ে দেখা দেয়।
বাঙালির সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরেই রুশ বিপ্লবের প্রভাব হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী। বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান দুই কাণ্ডারি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছাড়াও ওই বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল মানবেন্দ্রনাথ রায়, সুভাষ বসু ও মুজফ্ফর আহমেদের মতো বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। রুশ বিপ্লবের প্রভাব বাংলায় জন্ম দিয়েছে বামপন্থি ও শ্রেণিসচেতন রাজনীতির, সংহত করেছে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ নানা পেশা ও শ্রমজীবীদের সংগঠন ও আন্দোলনের; প্রেরণা জুগিয়েছে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাম শাসন চলেছে পশ্চিমবঙ্গে তেমনি বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্বে তার চার মূলস্তম্ভের অন্যতম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সমাজতন্ত্র। সদ্য ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য জাতিগুলোর মতো বাঙালিরাও সুযোগ পেয়েছিল সোভিয়েত বৃত্তির সুবাদে নিখরচায় উচ্চশিক্ষা লাভের। এটি ছিল উচ্চশিক্ষা বৃত্তির নামে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর দ্বারা গরিব দেশগুলোর মেধা আত্মসাৎ করার পাল্টা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্যবাদী তৎপরতা ও সংগঠন গড়ে ওঠার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকা বাঙালি মানবেন্দ্রনাথ রায় নামের আড়ালের আসল মানুষ নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য নিয়ে লিখেছেন সুচেতনা ভট্টাচার্য। মেহিকোপর্বে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সাম্যবাদীতে রূপান্তর পর্বের আলোচনা করেছেন ড্যানিয়েল কেন্ট-কারাস্কো। এছাড়া রুশ বিপ্লব ও তার প্রভাব নিয়ে নানা দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং স্মৃতিচারণামূলক আলোচনা রয়েছে বিশ্বরূপ সান্যাল, আনু মুহাম্মদ, সন্দীপন সেন, চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য্য, অরুণ সোম, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অমর মিত্র, শোভনলাল দত্তগুপ্ত, তুষার গায়েন এবং মশিউল আলমের। রুশ বিপ্লবের প্রেরণা পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কীরকম ছিল তার চিত্র বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায় বিধায় আমরা কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাটি এখানে পুনর্মুদ্রণ করছি। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের অনুসারী অনুশীলন দলের অনেকেই রুশ বিপ্লবের প্রেরণায় পরবর্তীকালে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার প্রভাত চক্রবর্তী তাঁদেরই একজন। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা সুচেতনা চট্টোপাধ্যায়ের প্রবেশকসহ আমরা এখানে পত্রস্থ করছি।
তৃতীয় বিশ্বের উত্তরৌপনিবেশিক দেশে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে ধর্মের প্রসঙ্গ ক্যুবা কীভাবে মোকাবিলা করছে তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন মিহির ভট্টাচার্য। একইভাবে নতুন চলচ্চত্রৈক সংস্কৃতি নির্মাণের ক্ষেত্রে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ শিল্পীর দৃষ্টি কীভাবে পর্দায় প্রতিফলিত হয় তার একটি সমান্তরাল আলোচনা করেছেন মানস ঘোষ তমাস গুতিয়েরেজ আলেয়া ও মৃণাল সেনকে নিয়ে। বছরটি বিপ্লবী এর্নেস্তো চে গেভারার হত্যাকাণ্ডের অর্ধশত বার্ষিকীও। তাঁকে উদ্দেশ্য করে রচিত কুবার কবি নিকোলাস গ্যিয়েনের কবিতাটি মূল স্পানঞল থেকে অনুবাদ করেছেন রাজু আলাউদ্দিন। সঙ্গে রয়েছে উৎসা ও প্রভাত পট্টনায়কের থিয়োরি অব ইম্পেরিয়ালিজম নিয়ে অমিয় বাগচীর গ্রন্থালোচনা, বিজ্ঞান ও প্রগতিশীল রাজনীতির মেলবন্ধনে অনন্য প্রতিভা জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে নিয়ে তুষার চক্রবর্তীর নিবন্ধ এবং মামুন হুসাইন, রঙিলী বিশ্বাস ও অলোক গোস্বামীর গল্প।
প্রচ্ছদ প্রসঙ্গে
বাংলা জর্নালের প্রচ্ছদ পরিকল্পনা ২০০২ সাল থেকে বাঙালি চারুশিল্পীদের কাজ তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়া হয়। কেবল শিল্পীর কাজই নয় সেই কাজ সম্পর্কে শিল্পীর নিজের কিছু কথাও আমরা প্রকাশের চেষ্টা করে থাকি। এই উদ্যোগে দুই বাংলার শিল্পীদের সমমাত্রায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারে গোড়া থেকে সহায়তা করে আসছেন কবি নমিতা চৌধুরী। তার অকৃত্রিম সহায়তা আমাদের কাজটা অনেক সহজ করে দিয়েছে। এজন্য আমরা তার কাছে ঋণী।
স্মরণে
রেবা বসু (১৯২৬-২০১৭)
চার বছরের মাথায় এই পত্রিকার অন্যতম সুহৃদ পৃষ্ঠপোষক দম্পতির শেষজন রেবা বসু মারা গেলেন এই বছরের ১৭ই মে, ভোর পাঁচটা নাগাদ কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের ভিক্টোরিয়া শহরের একটি হাসপাতালে। ২০১৩ সালে মারা যান তাঁর স্বামী প্রশান্তকুমার বসু। আগেই যেমন বলেছি, এই পত্রিকা-প্রকল্প গোড়া থেকেই প্রশান্তদা এবং রেবা বউদির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রশ্রয়ে ও অনুপ্রেরণায় সিক্ত হয়েছে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মাতৃস্নেহের পরশে আমাকে করে গেছেন চিরঋণী। রেবা বউদি তাঁর প্রাঞ্জলতা, সাহিত্য ও সঙ্গীতানুরাগ, মানুষে মানুষে ভালোবাসা এবং সৌহার্দ্যের পরিচয়ে নিজেকে যেমন গড়ে তুলেছিলেন তেমনি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেছেন। সরাসরি বৈঠকি আসরে তাঁর নিজস্ব গায়কীতে রবীন্দ্রনাথের গান শোনার অভিজ্ঞতা আমার কাছে অমূল্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে। কিন্তু অন্য কারও গলায় গান ভালো লাগলে রেখা বউদি নিঃসঙ্কোচে কোনও ভণিতা ছাড়াই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। এবং নিজের ভালোলাগাটি সেই ব্যক্তিকে জানানোয় কোনও কার্পণ্য করতেন না। প্রথাগত বাঙালি ঘরনীর ভূমিকায় না থেকে রেবা বসু তাঁর স্বভাবজ মুক্তমন নিয়ে চেষ্টা করে গেছেন নিজেদের ঐতিহ্যের ইতিবাচক দিকগুলোর চর্চা করার পাশাপাশি বিদেশির সংস্কৃতির উৎকর্ষকে নিজের যাপিত জীবনের অঙ্গ করে নিতে। ওই একই তাগিদ থেকে ঘরকন্নার দাবি মিটিয়েও নিজস্ব সত্তা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং নাতি ও শ্বশুরকে দিয়ে বই লেখার কাজও করেছেন। কানাডার প্রবাসী বাঙালি মহলে কারও নজর এড়ায়নি তাঁর এ বৈশিষ্ট্য। মৃত্যুর পর প্রথাগত সৎকারের বদলে রেবা বসুও চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রয়োজনে তাঁর প্রয়াত স্বামী প্রশান্ত বসুর মতো দেহদান করে গেছেন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।