আমাদের বর্তমান সংখ্যাটির মূল আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছিল, পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সমকালিক লড়াই: বাংলায় এবং অন্যত্র, সাধারণত আমরা বছরের শুরুতে যখন মূল আলোচ্য একটি বিষয় বেছে নিয়ে লেখা আহ্বান করে থাকি সেজন্য ছয় থেকে সাত মাস সময় দিয়ে থাকি যেন আমরা বিষয়টির ওপর যথেষ্ট পরিমাণে লেখা পাই এবং তা থেকে যাচাই বাছাই করে লেখা ছাপতে পারি। বিষয় নির্ধারণ করে লেখা আহ্বান থেকে শুরু করে লেখা জমা নেওয়ার সর্বশেষ সময়সীমার মধ্যে রাষ্ট্রিক-সীমান্তিক-অসীমান্তিক, স্থানিক বা আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাষিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বাংলা বা বাঙালির জীবনে অনেক কিছুই ঘটে যায় যা আমাদেরকে ভাবিত, তাড়িত করলেও সে সম্পর্কে তৎক্ষণাৎ আলোকপাত করার জন্য বিষয় পরিবর্তন করে প্রস্তুতি নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে ঘটমান বিষয়গুলো এখনও ঘোলাটে এবং দুই বাংলার মধ্যেকার ভাষিক-সাংস্কৃতিক হাজার বছরের ঐতিহাসিক যূথভাবনায় বড়ো ধরনের অভিঘাত তৈরি করছে যার চেহারাটি স্পষ্ট নয় তাই এ সংখ্যায় এ প্রসঙ্গে কোনোকিছুরই উল্লেখ আমরা করছি না। তাছাড়া নির্মোহ দৃষ্টিতে আলোকপাত করার জন্য সময়ের দূরত্বটাও অপরিহার্য। তবে বিগত সংখ্যায় কাকতালীয়ভাবে আমরা যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার বেগ অনেকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন ধরনের অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা তৈরি করা; মুঠোফোন, ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদির ব্যবহারে মনোজগতে এর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় নিরন্তর ঘটে যাওয়া সামাজিক দৃশ্যপটের সত্য- মিথ্যা যাচাই, ভুয়ো খবর এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের মধ্যেকার তফাৎ নির্ণয়ের জটিলতা ও সমস্যার কথাগুলো বলেছিলাম বাংলাদেশে ঘটমান পরিস্থিতিতে তাইই যেন অপ্রিয় বাস্তবতা হয়ে আমাদের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে।
এবারের সংখ্যায় মূল আলোচ্য বিষয় ‘পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াই’-এর একটি সমকালীন ছবি উঠে এসেছে লাবনী জঙ্গীর আলোচনায়। তিনি তাঁর রচনায় মুর্শিদাবাদের মুসলমান শ্রমিক সমাজে নারীরা শিক্ষার আলোকবঞ্চিত হয়েও নিজেদের অবস্থান থেকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারে ন্যায়সঙ্গত বন্টনের সংগ্রামটা কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তার ওপর আলোকপাত করেছেন। অন্যদিকে জনম মুখার্জির জীবনাভিজ্ঞতাভিত্তিক রচনাটিতে ধরা পড়েছে বাঙালি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বহমান পুরুষতান্ত্রিকতার জাঁতাকলে ঘরের মহিলা এবং মহিলা গৃহকর্মীদের নিপীড়িত ও বঞ্চিত হওয়ার অনুপুঙ্খ ছবি। বর্ণালী পাল তাঁর আলোচনায় পেশ করেছেন বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গ্রন্থ রচনায় স্ত্রীরোগ বিষয়ে পুরুষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসের নমুনা। পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে ভিন্ন একটি বর্গের লড়াইকে শীর্ষাঙ্কর বসু তাঁর বিস্তৃত আলোচনায় রূপান্তরকামীদের শরীরভাষ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন।
দুটো অনুবাদ আমরা এ সংখ্যায় প্রকাশ করছি। একটি ভি. রামস্বামীর করা শওকত আলীর উপন্যাস নাঢ়াই থেকে কিছু অংশ এবং অন্যটি ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সংক্রান্ত মামলায় সূর্যসেন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের অপ্রকাশিত দলিল। এটি অনুবাদ করেছেন শওকত মোস্তফা। দলিলটির সম্পূর্ণ অনুবাদ আমরা জর্নালে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করব।
এছাড়া জর্নালের এ সংখ্যায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে বিজলীরাজ পাত্র, সন্দীপন সেন এবং ফকরুল আলমের তিনটি প্রবন্ধ; ঈশোপনিষদের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আত্মজিৎ মুখোপাধ্যায়, বাংলাভাষার অবকাঠামো নিয়ে অরিত্র মজুমদার, ঋত্বিক ঘটকের তিতাস নিয়ে অভীক মজুমদার, গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রে গান নিয়ে সত্যজিতের ছক ভাঙার বিষয়ে ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায়, উচ্চাঙ্গ সংগীতে অন্নপূর্ণার স্বতন্ত্র শিল্পকুশলতা নিয়ে মালিনী সিদ্ধান্ত, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে পারমিতা চক্রবর্তী, আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রী বিষয়ে দেবস্মিতা শীট, দেশভাগের সময়ে শ্রেণিযুদ্ধ নিয়ে ফারুক চৌধুরীর রচনার পাশাপাশি একরাম আলী, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় নন্দী, সুধীর দত্ত ও তুষার গায়েনের কবিতা এবং রঙিলী বিশ্বাস ও অমর মিত্রের গল্প।